রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় গ্যাং কালচারের বিস্তার এখন জনমনে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। জিন্স-টি-শার্ট পরা, ব্রাউন চুলের উঠতি বয়সী এসব কিশোরদের হাতে প্রকাশ্যে রামদা ও সিগারেটের দৃশ্য এখন নিয়মিত ঘটনা। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল এবং খুন-খারাবির মতো অপরাধের সাথে তারা জড়িয়ে পড়ছে। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীর ৮টি ক্রাইম জোনে ১৬০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের সদস্য সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১১৮টি, অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রাজধানীতে গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি গ্যাং কালচারের বিস্তার ঘটেছে ডিএমপি’র তেজগাঁও এবং মিরপুর বিভাগে। তেজগাঁও বিভাগে ৪১টি এবং মিরপুর বিভাগে ৩৫টিসহ এই দুই বিভাগে মোট ৭৬টি গ্যাং রয়েছে। এছাড়া ওয়ারীতে ২০টি, মতিঝিলে ১৬টি, উত্তরায় ১৫টি, রমনায় ১২টি, গুলশানে ১১টি এবং লালবাগে ১০টি গ্যাং সক্রিয়। থানা ভিত্তিক পরিসংখ্যানে মোহাম্মদপুর শীর্ষে রয়েছে, যেখানে ২৭টি গ্যাংয়ের ৪৮১ জন সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এদের মধ্যে পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, ল ঠেলা গ্রুপসহ বিভিন্ন অদ্ভুত নামের গ্যাং প্রকাশ্যে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। মোহাম্মদপুরের পরেই পল্লবী এলাকায় ১৬টি গ্যাং সক্রিয়, যার মধ্যে আশিক গ্রুপ ও ৬.৯ ইয়াসিন গ্রুপ অন্যতম।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় বর্তমানে ৮টি গ্যাং পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারে লিপ্ত রয়েছে। ২০১৭ সালে উত্তরার স্কুলছাত্র আদনান কবির খুনের মাধ্যমে গ্যাং কালচারের ভয়াবহতা প্রকাশ্যে এলেও উত্তরা বিভাগে এখনো ১৫টি গ্যাং সক্রিয়। এছাড়া খিলগাঁও, হাজারীবাগ, আদাবর, দারুসসালাম ও বনানীতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্যাংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক নজরদারির অভাব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং খেলার মাঠের সংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিশোরদের অপরাধী করে তুলছে। রাজনৈতিক নেতারা সস্তায় জনবল পাওয়ার আশায় এদের ব্যবহার করছেন, যা তাদের অপরাধের ঢাল হিসেবে কাজ করে।
সমাজ ও অপরাধ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক জানান, রাজনৈতিক বা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এসব কিশোর গ্যাং তাদের আধিপত্য বিস্তার করছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ায় তারা জামিনে বেরিয়ে এসে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, প্রচলিত ‘কিশোর আইন’ এবং কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর আইনি বাধ্যবাধকতা গ্যাং দমনে অন্যতম বড় বাধা। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মো. আকতার হোসেনের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ডিএমপি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।

















