ইসলামের পবিত্রতম নগরী মক্কায় সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে পাকিস্তান। গত ৭ আগস্ট মক্কায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, চুক্তির কোনো এক পক্ষের ওপর হামলাকে সব পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ধারাটি ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনীয়।
তবে, চুক্তি স্বাক্ষনের অল্প সময়ের মধ্যেই এর কার্যকারিতা পরীক্ষার মুখে পড়ে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই হামলার পর রিয়াদের সঙ্গে সামরিক পাল্টা অভিযানে ইসলামাবাদ বা আঙ্কারা কেউই অংশ নেয়নি। তারা এর পরিবর্তে কঠোর কূটনৈতিক বিবৃতি দেওয়ার পথ বেছে নেয়। এর ফলে পাকিস্তানের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সৌদির প্রতি নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কীভাবে রক্ষা করবে ইসলামাবাদ, অথচ একই সঙ্গে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এড়ানো সম্ভব হবে?
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সাংবাদিকদের বলেন, পাকিস্তান এই চুক্তির শর্তের কারণে “বাধ্য” এবং প্রয়োজন হলে তা মেনে চলবে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দার খান স্পষ্ট করে বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে কোনো আলোচনা এখনো হচ্ছে না। তিনি জানান, পাকিস্তান একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, এটি একটি বাস্তবতা, কিন্তু এই মুহূর্তে এ ধরনের কোনো আলোচনা নেই। এই প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংহতি এবং সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা সৌদি আরবের সঙ্গে জোটের সম্পর্ক এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে স্পর্শকাতর সম্পর্ক—দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে পাকিস্তানকে।
সৌদি আরবে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত পৃথক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর আওতায় চলতি বছরের এপ্রিলে সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে যে পাকিস্তানের সেনা সদস্যদের পাশাপাশি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান ও সহায়ক বিমান সৌদির কিং আবদুলআজিজ বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে।
উপসাগরীয় বিষয়াবলি সম্পর্কে অবগত এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, ইসলামাবাদের বর্তমান অবস্থান কিছুটা হলেও ২০১৫ সালের সংকটের পুনরাবৃত্তি। সেবার পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার পরিবর্তে নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তে রিয়াদের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল।
পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং তা অনেকটাই হুতিদের তৎপরতার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাকিস্তানি ওই কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও তীব্র হলে অথবা সৌদির কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে মোতায়েন পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটলে, ইসলামাবাদে জনমত ও রাজনৈতিক চাপ সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বর্তমান অস্পষ্ট অবস্থানই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির সরাসরি পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য এই কৌশলগত সমীকরণের সবচেয়ে জটিল উপাদান হলো ইরান। প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া দুই দেশ নিয়মিতভাবে পারস্পরিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। হুতিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক অভিযান তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ইরানের একটি প্রক্সির বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান-ইরান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা চাপ তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধান সামরিক উদ্বেগ এখনো ভারত। এর সঙ্গে সীমান্তপারের জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে উত্তেজনাও পাকিস্তানের নিরাপত্তা হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে। সৌদির অগ্রাধিকার ভিন্ন। রিয়াদের প্রধান উদ্বেগ হলো নিজেদের ভূখণ্ড, জ্বালানি অবকাঠামো ও সামুদ্রিক রুট সুরক্ষিত রাখা। একই সঙ্গে ইরান এবং হুতিদের মতো সশস্ত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর হুমকি মোকাবিলা করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণ সীমান্তে। তুরস্কের নিরাপত্তা পরিধি আরও বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও ককেশাস। এই ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—কোনো সদস্য যদি এমন একটি সংঘাতের মুখোমুখি হয়, যেটিকে অন্য সদস্য নিজের সংঘাত হিসেবে মনে করে না, সেক্ষেত্রে তাকে রক্ষায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক মূল্য দিতে প্রত্যেক সদস্য কি প্রস্তুত থাকবে?

















