অত্যন্ত প্রয়োজনে ঋণ নেওয়া ইসলামে বৈধ হলেও অপ্রয়োজনে ধার করাকে চরম নিন্দনীয় কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। ঋণের বোঝা মানুষকে সমাজে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করে তোলে, যার ফলে অনেক সময় মানুষ আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নেয়। ইসলামে ঋণ গ্রহণ মোমিনের জান্নাত লাভের পথে একটি বড় অন্তরায়। রাসুল (সা.) মৃতের সম্পদ উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টনের আগে তার ঋণ পরিশোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, যা সুনানে ইবনে মাজাহর ২৪৩৩ নম্বর হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি শহিদের সব গোনাহ মাফ হয়ে গেলেও ঋণ মাফ হয় না, যেমনটি মুসলিম শরিফের ৪৭৭৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করা একজন মোমিনের কর্তব্য, কারণ এটি একটি প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা। পবিত্র কুরআনের সুরা মায়িদার ১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা বনি ইসরাইলের ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ওয়াদা ভঙ্গ করা মোনাফিকের লক্ষণ, যা বোখারি শরিফের ৩৩ নম্বর হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে তা পরিশোধের যথাযথ চেষ্টা চালায়, তবে আল্লাহ তার আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। সুরা তালাকের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, যে কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। বোখারি শরিফের ২৩৮৭ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে ঋণ নেয়, আল্লাহ তা আদায়ের ব্যবস্থা করেন, আর যে আত্মসাতের নিয়তে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।
সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করা জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। বোখারি শরিফের ২২৮৭ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) ধনী ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করাকে জুলুম বলে অভিহিত করেছেন। তবে যথাযথ চেষ্টা করার পরও যদি কেউ নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধে অক্ষম হয়, তবে সে গোনাহগার হবে না। এমতাবস্থায় ঋণদাতার কাছে বিনম্রভাবে নিজের অপারগতা প্রকাশ করে সময় বাড়িয়ে নেওয়া উচিত।
ঋণদাতা বিপদে সাহায্য করেছেন বিধায় তার পাওনা উত্তমরূপে পরিশোধ করা মানবিক দায়িত্ব। সুরা আর রহমানের ৬০ নম্বর আয়াতে উত্তম কাজের প্রতিদান উত্তম হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঋণদাতা রূঢ় আচরণ করলেও তার সঙ্গে সদাচরণ করা কাম্য। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, একজন ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে পাওনা আদায়ের জন্য রূঢ় ভাষায় কথা বললে নবীজি (সা.) সাহাবিদের তাকে বাধা দিতে নিষেধ করেন এবং উত্তমরূপে ঋণ পরিশোধের শিক্ষা দেন (বোখারি: ২৩০৬)।
পাওনাদারের সঙ্গে সবসময় নম্র ও বিনয়ী আচরণ করা প্রয়োজন। রাসুল (সা.) পাওনাদারের রূঢ় আচরণের বিপরীতেও কোমলতা প্রদর্শন করতেন এবং ঋণ পরিশোধের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন। সুনানে ইবনে মাজাহর ২৪২৬ নম্বর হাদিসে বর্ণিত ঘটনা থেকে বোঝা যায়, পাওনাদারের অধিকার রয়েছে কড়া কথা বলার। রাসুল (সা.) বলেছেন, উত্তম লোকেরা ঋণ পরিশোধের বেলায় সর্বোৎকৃষ্ট হয়।
পরিশেষে, ঋণ পাওয়া এবং প্রয়োজন পূরণ হওয়া আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এই অনুগ্রহের জন্য রবের শোকরিয়া আদায়ের পাশাপাশি ঋণদাতার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা বাঞ্ছনীয়। রাসুল (সা.) বলেন, যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয় (তিরমিজি: ১৯৫৫)। ঋণদাতার জন্য ‘জাযাকাল্লাহু খাইরান’ বলে দোয়া করার শিক্ষা হাদিসে দেওয়া হয়েছে (তিরমিজি: ২০৩৫)।

















