দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম প্রধান সংকট ‘পাহাড় সমান’ খেলাপি ঋণ থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়া, আদায় করা এবং প্রয়োজনে জামানত বিক্রির সুযোগ রেখে সরকার নতুন আইন করতে যাচ্ছে। ‘সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন’ বা ডামা আইনের আওতায় গড়ে উঠবে বিশেষায়িত বেসরকারি কোম্পানি, যারা মূলত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতিমধ্যে সবার মতামতের জন্য এই আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন, ২০২৫’ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি, অবলোপন করা, পুনঃ তফসিল করা এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ মিলিয়ে সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, তারা এই আইনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মতামত আশা করছেন।
বর্তমানে আইনি জটিলতা, আদালতে মামলা এবং সম্পদ বিক্রির দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বছরের পর বছর আটকে থাকছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। নতুন আইনের খসড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ইউনিটের লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারি পর্যায়ে সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি এবং ঋণ সেবাদাতা কোম্পানি কাজ করবে।
নতুন এই ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো চাইলে তাদের খেলাপি ঋণ এই কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করতে পারবে। তখন ওই কোম্পানি ঋণ আদায়, পুনর্গঠন, জামানত ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রির দায়িত্ব নেবে। সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের জন্য কঠোর শর্তের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটিকে কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হবে, নির্ধারিত মূলধন থাকতে হবে এবং পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের ব্যাংকিং, অর্থনীতি, আইন বা সম্পদ পুনরুদ্ধারে অভিজ্ঞ হতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্যকে স্বাধীন পরিচালক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর, নতুন বিনিয়োগকারী আনা কিংবা ব্যবসার অংশ বিক্রির মতো পদক্ষেপ নিতে পারবে। এছাড়া ঋণ সেবাদাতা কোম্পানিগুলো ঋণগ্রহীতার সাথে আলোচনা ও আইনি সহায়তার কাজ করবে, তবে তারা সরাসরি মামলা করতে পারবে না বা আমানত নিতে পারবে না।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান এই উদ্যোগটিকে কার্যকর করতে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, আইনি জটিলতা দূর করা এবং জামানত স্থানান্তরের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বিধান রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। খসড়া আইনে সিকিউরিটাইজেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে বন্ড ইস্যু বা বিনিয়োগ তহবিলের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করা যাবে। এছাড়া সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট যেকোনো সময় কোম্পানির তথ্য ও নথি যাচাই করতে পারবে এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিল বা জরিমানা করার ক্ষমতা রাখবে।
২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার সময়ের কথা স্মরণ করে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার বলেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি আগেও দুই–তিনটা ছিল। তারা খেলাপি গ্রাহকদের সামনে গিয়ে কখনো ঢোল পেটাত, কখনো বা তাঁদের কাছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পাঠাত। তিনি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন যে, অতীতের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, আইনটি বাস্তবায়িত হলে খেলাপি ঋণের জন্য একটি বিশেষায়িত বাজার গড়ে উঠবে, যা ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।

















