একসময় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কৃষকদের কাছে ধান, পাট ও ভুট্টার মতো প্রচলিত ফসলের বাইরে অন্য কিছু চাষাবাদের কথা ভাবা কঠিন ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন জাতের বিদেশি ফল চাষের মাধ্যমে উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তারা নতুন এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছেন। বর্তমানে অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, ড্রাগন, আনারকলি ও আঙুরের মতো বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষে অনেকেই লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। প্রায় ১৫ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই চাষ এখন রীতিমতো বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
আগে মনে করা হতো বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ অসম্ভব, কারণ এটি মূলত আমদানিনির্ভর ফল ছিল। কিন্তু উন্নত জাত ও আধুনিক পদ্ধতির কল্যাণে এখন জীবননগরে সফলভাবে আঙুর উৎপাদিত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, এখানকার উর্বর পলিমাটি এসব বিদেশি ফলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, যেখানে খরচ কম এবং ফলন অনেক বেশি পাওয়া যায়। উৎপাদিত এসব ফল বর্তমানে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের বড় বড় বাজারের চাহিদাও পূরণ করছে।
পরীক্ষামূলক আনারকলি চাষে সাফল্য পেয়েছেন অনন্তপুর গ্রামের কৃষক আকশেদ আলী। দশ বছর ধরে ড্রাগন ও মাল্টা চাষের অভিজ্ঞতা থাকা আকশেদ আলী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে চারা সংগ্রহ করেন। মাত্র ছয় মাসের মাথায় গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং আগস্টের শুরু থেকে তিনি পাকা ফল বাজারজাত শুরু করেছেন। একইভাবে রাজাপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সজল আহমেদ ২০১৪ সালে ৯ বিঘা পেয়ারা বাগান দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে ১৪০ বিঘা জমিতে ২০০ ধরনের দেশি-বিদেশি ফলের বিশাল বাগান গড়ে তুলেছেন। তাঁর প্রকল্পে মরক্কো, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার জাতসহ প্রায় ১০ প্রজাতির মাল্টা চাষ হচ্ছে।
উথলী গ্রামের কৃষক আশরাফুজ্জামান মিলু ও রাজু আহমেদ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় ড্রাগন, মাল্টা ও থাই পেয়ারা চাষে সফল হয়েছেন। উপজেলার উথলী গ্রামের কৃষক আশরাফুজ্জামান মিলু ২০১০ (২০১০) সাল থেকে ড্রাগন ও মাল্টা চাষ করছেন। ২০১০ সালে আপেল কুল চাষের মাধ্যমে তাঁর ফল চাষে হাতেখড়ি। এছাড়া হাসাদাহ গ্রামের দুই ভাই আশরাফুল ও তরিকুল ইসলাম সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে ৭৫০টি আঙুর গাছ লাগিয়ে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জীবননগরে ৬৮৮ হেক্টর ড্রাগন, ৩১২ হেক্টর মাল্টা, ১২০ হেক্টর কমলাসহ মোট হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে।
এসব বাগান দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক চাষ কেবল কৃষকদের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও শক্তিশালী করে তুলছে।

















