বর্তমান পৃথিবীর অস্থির জলবায়ু, এল-নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ এবং গাজাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতার এই সময়ে শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ কবিতাটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইয়েমেন, কাশ্মীর, সুদান, নাইজেরিয়া, ইউক্রেন কিংবা মিয়ানমারের মানুষের আর্তনাদ যখন বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন এই কবিতাটি কেবল প্রেমের আশ্বাসবাণী নয়, বরং এক যুদ্ধমুক্ত মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়। কবি এখানে ব্যক্তিগত আবেগের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, সামরিক বাহিনী এবং বিপ্লবকে কবিতার মূল উপজীব্য করে তুলেছেন।
কবিতাটির আধুনিকতা নিহিত রয়েছে এর কাঠামোগত বৈপরীত্যে। বারবার ফিরে আসা ‘ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো’ পঙক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে প্রেমিকের আশ্বাস মনে হলেও, এর ভেতরেই ঢুকে পড়ে সমরমন্ত্রী, রণতরী, বি-৫২ বিমান, মিগ-২১, মুদ্রাস্ফীতি ও নির্বাচনের মতো রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠোর শব্দগুচ্ছ। কবি এখানে ব্রেখটীয় বিচ্ছিন্নকরণ কৌশলের মতো পরিচিত যুদ্ধ ও ক্ষমতার শব্দভাণ্ডারকে প্রেমের অভিধানে স্থাপন করেছেন। এর ফলে সামরিক শক্তি ধ্বংসের প্রতীক না হয়ে বরং ভালোবাসার সেবায় নিয়োজিত হওয়ার এক অসম্ভব ও বিদ্রূপাত্মক চিত্র তৈরি করে, যেখানে যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নয়, ঝরে পড়ে চকোলেট ও টফি।
শহীদ কাদরীর এই ব্যঙ্গাত্মক শৈলী সরাসরি রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি যখন লেখেন সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ নিয়ে মার্চপাস্ট করবে বা রণতরী পরিচালনা করবেন একজন কবি, তখন তা ক্ষমতার ভাষাকে তার নিজের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। পাবলো নেরুদার কবিতার মতোই এখানে ব্যক্তিগত প্রেম ও সামষ্টিক ইতিহাস একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। পরিশেষে, ‘প্রিয়তমা’ শব্দটি এখানে কেবল একজন নারী নয়, বরং এটি একটি মানবিক ও কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের প্রতীক, যা মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয়কে ধারণ করে।

















