সাহাবিরা ছিলেন নববি ইলমের প্রকৃত ধারক ও বাহক। নবীজি (সা.)-এর জীবদ্দশায় কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য হলে তারা সরাসরি তার কাছে সমাধান নিতেন। তবে তার ইন্তেকালের পরও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য হয়েছে এবং সময়ের সাথে সাথে স্কলারদের ক্ষেত্রেও এর হার বেড়েছে। মূলত মতপার্থক্য যখন সীমার মধ্যে থাকে তখন তা সৌন্দর্য হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু সীমালঙ্ঘন করলে তা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
বনু কুরাইজার অভিযানের সময় সাহাবিদের মধ্যে মতপার্থক্যের একটি ঘটনা ঘটেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, বনু কুরাইজায় না পৌঁছানো পর্যন্ত যেন কেউ আসরের নামাজ না পড়ে। পথে আসরের সময় হয়ে গেলে সাহাবিদের একাংশ আক্ষরিক অনুসরণে বনু কুরাইজায় পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিলেন, আবার অন্য অংশ নামাজের সময়ের গুরুত্ব দিয়ে পথেই নামাজ পড়ে নেন। নবীজি (সা.) বিষয়টি জানার পর কোনো পক্ষকেই ভুল বা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি (বোখারি : ৪১১৯)।
জাতুস সালাসিল যুদ্ধে সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.) হাড়কাঁপানো ঠান্ডার কারণে ফরজ গোসল না করেই ফজরের নামাজের ইমামতি করেছিলেন, যাতে ঠান্ডা পানিতে শারীরিক ক্ষতি না হয়। তিনি সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে তার অবস্থানের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন, যা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) হেসে দেন এবং কোনো নিন্দা করেননি (আবু দাউদ : ৩৩৪)।
বদরের যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর ভিন্নমত ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য। আবু বকর (রা.) ক্ষমা ও সুযোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, আর উমর (রা.) কঠোর শাস্তির মত দিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের এই মতপার্থক্যকে নবীগণের বিভিন্ন আচরণের সাথে তুলনা করে দেখান। তিনি বলেন, ‘আবু বকর, তুমি হলে ইবরাহিমের (আ.) মতো, যিনি বলেছিলেন, ‘যে আমার অনুসরণ করেছে নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৬)। আবার আবু বকর, তুমি হলে ইসার (আ.) মতো। যিনি বলেছিলেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মায়িদা : ১১৮)।’ পরবর্তীতে আল্লাহ উমর (রা.)-এর মতের সমর্থন করলেও সাহাবিদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে কোনো ঘাটতি হয়নি (মুসনাদে আহমাদ : ৩৬৩২; সুরা আনফাল : ৬৭)।
একবার বনু তামিম গোত্রের লোক নির্বাচন নিয়ে আবু বকর ও উমর (রা.)-এর মধ্যে উচ্চস্বরে তর্কাতর্কি হয়। এর প্রেক্ষিতে পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ২ নম্বর আয়াত নাজিল হয়। এরপর থেকে উমর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এত নিচু স্বরে কথা বলতেন যে, অনেক সময় তাকে কথা দ্বিতীয়বার বলতে হতো (বোখারি : ৪৮৪৫)। এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায় যে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ইসলামের মূল কাঠামোর প্রতি অবিচল থাকা কতটা জরুরি।

















