বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এক বছরে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৫৩ জন বেশি। ২০০০ সালের পর থেকে এটিই দেশে এইচআইভি সংক্রমণের সর্বোচ্চ হার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই সময়ে এইডস-সম্পর্কিত অসুস্থতায় ২৫৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্যে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশের পরীক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৩টি জেলায় এইচআইভি পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ সেবা চালু আছে। বাকি ৪১ জেলায় পর্যাপ্ত পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে যশোর জেলায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত রোগী পাওয়া গেছে। এর পরেই রয়েছে নাটোর জেলা। তৃতীয় সর্বোচ্চ শনাক্তকারী এলাকা হলো সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সোনা মসজিদ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগে স্ক্রিনিং কম হওয়ায় শনাক্তের সংখ্যাও কম ছিল, বর্তমানে পরীক্ষার পরিধি বাড়ায় রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস/এসটিডি বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. খালিদ সাইফুল্লাহ ‘আমার দেশ’-কে বলেন, পূর্বে ব্লাড ক্রস ম্যাচিং এবং এইচআইভি স্ক্রিনিং টেস্ট সঠিকভাবে বা পর্যাপ্ত পরিমাণে করা হতো না। বর্তমানে এসব পরীক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়ায় এবং পরিধি বাড়ায় রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা চালানো হলে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের জরিপ কাজ ও সরেজমিন পরিদর্শন অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবসে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা ও জাতীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন সংক্রমণ মূলত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত পুরুষ (এমএসএম), ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভির বিস্তার ঐতিহাসিকভাবে শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশের নিচে রয়েছে। তবে সংক্রমণ মূলত ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি, পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত পুরুষ, নারী যৌনকর্মী, ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী এবং অভিবাসী শ্রমিকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি কেন্দ্রীভূত।
গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, এসব জনগোষ্ঠীর কাছে প্রতিরোধমূলক সেবা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা পর্যাপ্তভাবে পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক বৈষম্য, তথ্যের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতার কারণেও অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তে বিলম্ব হতে পারে।
সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে আনুমানিক ১৭ হাজার ৪১০ জন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সূত্রে বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ১৪ হাজার ১৩১টি নিবন্ধিত রোগীর তথ্য রয়েছে।
দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ক্ষেত্রে গবেষণাটি কিছু অগ্রগতির কথা তুলে ধরলেও, আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এইচআইভিতে আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশকে রোগ সম্পর্কে জানতে হবে, তাদের ৯৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে এবং চিকিৎসা গ্রহণকারীদের ৯৫ শতাংশের ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
এইডস রোগী কেন বাড়ছে—এ বিষয়ে পিজি হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী ‘আমার দেশ’-কে বলেন, জটিল ও সংক্রমিত রোগটি নিয়ে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা হচ্ছে না, এটি রোগী বাড়ার অন্যতম একটি কারণ। তিনি আরও বলেন, আগে যেখানে ৫০০ জন শনাক্ত হতো, বর্তমানে তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক রোগী শনাক্ত হলেও সরকার থেকে যে ওষুধ দেওয়া হয়, তা অনেকেই নিয়মিত খেতে চান না। এই অনিয়মিত ওষুধ সেবনও রোগী বাড়ার একটি কারণ। অপরদিকে, এইডস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদেশি সহায়তা কমছে। এখনই বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ না নিলে এইডস-এর বিস্তার বাড়তেই থাকবে এবং তখন তা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে বলে এই অভিজ্ঞ চিকিৎসক আগাম সতর্ক করেছেন।
বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় এইচআইভি ও এইডস কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৪-২০২৮ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এইডসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে অবসানের বৈশ্বিক লক্ষ্য সামনে রেখে দেশীয় কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। পরিকল্পনাটিতে প্রতিরোধ, রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা এবং গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউএনএইডসের ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছিলেন। ওই বছর নতুন করে প্রায় ১২ লাখ মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ এইডস-সম্পর্কিত অসুস্থতায় মারা যান। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ মানুষ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসা গ্রহণ করছিলেন।
এ প্রসঙ্গে সংক্রমিত ব্যাধি হাসপাতালের গবেষক ডা. শ্রীনিবাস পাল ‘আমার দেশ’-কে বলেন, নারী যৌনকর্মীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে রয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ। তিনি মনে করেন, এসব কার্যক্রমের ফলে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। একই ধরনের কার্যক্রম অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যহীন পরিবেশে পরিচালনা করা প্রয়োজন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতি জনঘনত্ব ও অন্যান্য বাস্তবতার কারণে দেশের সামগ্রিক এইচআইভি পরিস্থিতির সঙ্গে একভাবে বিবেচনা না করে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

















