আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ স্থাপনে সিদ্ধান্তহীনতা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের অবকাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করছে। সময়মতো নতুন সক্ষমতা যুক্ত করতে ব্যর্থ হলে আগামী এক দশকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি মারাত্মক বাধার সম্মুখীন হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। গত সোমবার ঢাকার অদূরে টেলিকম ও টেকনোলজি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে।
কর্মশালায় সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান এবং মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্প প্রধান মাহমুদ শাহেদ সাবমেরিন ক্যাবলের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চাহিদার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। মেটাকোর সাবকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, বেসরকারি খাতে সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব আরও সুসংহত হবে। এতে ইন্টারনেটের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে, সেবার মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং বিলম্বকাল (ল্যাটেন্সি) উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। তার দাবি, নতুন সংযোগ চালু হলে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৩ বছরে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার প্রায় ২৬০ গুণ বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড, সেখানে ২০২৬ সালে তা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ দুটি সরকারি সাবমেরিন ক্যাবল—সি-মি-উই-৪ (৪.৬ টেরাবিট) এবং সি-মি-উই-৫ (২.৫ টেরাবিট)-এর ওপর নির্ভরশীল। এর বাইরে অবশিষ্ট ব্যান্ডউইথ টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবলের মাধ্যমে আমদানি করা হয়।
বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো যেখানে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে বাংলাদেশের সংযোগ এখনো সীমিত। ফলে কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি দেখা দিলে জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। এছাড়া সি-মি-উই-৪ ক্যাবলের মেয়াদ ২০৩০ সালে শেষ হয়ে যাবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যেই ব্যান্ডউইথের বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সি-মি-উই-৬ চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা যথেষ্ট হবে না। তাই বেসরকারি খাতে নতুন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখছেন। প্রস্তাবিত ক্যাবলগুলো চালু হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হয়ে মোট সক্ষমতা ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে, যা ভারত থেকে আমদানির নির্ভরতা কমাবে। যেহেতু সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা ও নির্মাণে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ডিজিটাল অবকাঠামোগত সংকটের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে বলে তারা মন্তব্য করেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, গত এক দশকে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড, ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৭৬ টেরাবিটে। ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২, ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ এবং ২০২৬ সালে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৩ বছরে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু বর্তমান ব্যান্ডউইথ চাহিদা মেটানোর নয়; বরং ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের বাংলাদেশের ডিজিটাল সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও চালু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই সংকট দৃশ্যমান হওয়ার পর উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনীয় সময়ে সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নাও হতে পারে। সিদ্ধান্তহীনতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বড় ধরনের ডিজিটাল অবকাঠামোগত সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।

















