গত জুন ও জুলাই মাসে সরকার দেশের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা এবং ৮টি নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বর্তমান ও সাবেক ১৭ জন নেতাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। তবে নিয়োগের শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক থাকলে তা যোগদানের আগেই পরিত্যাগ করতে হবে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই শর্তের তোয়াক্কা না করেই নিয়োগপ্রাপ্তরা এখনো তাঁদের দলীয় পদ আঁকড়ে আছেন।
বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে গত ২৩ জুলাই বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এই নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ করে তিনি এখনো দলের সম্পাদকের পদে বহাল আছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, তিনি মৌখিকভাবে দপ্তরে পদ না রাখার কথা জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ১৮ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জেল খাটার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বড় এবং দলীয় পদ ছাড়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
একইভাবে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান জানান, তিনি সরকার ও দলের সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করছেন। তবে ১১টি সংস্থার মধ্যে অন্তত ৯ জন এবং ৮টি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে ৬ জন—অর্থাৎ মোট ১৫ জন নিয়োগের সময় দলীয় পদে ছিলেন। এর মধ্যে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম মহানগর বিএনপির সভাপতি, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, রংপুর ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্তরের নেতারাও সরকারি পদে যোগ দিয়েও দলীয় পদ ছাড়েননি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, দপ্তরে তাঁদের কারও পদত্যাগপত্র জমা পড়েনি। দল থেকেও তাঁদের কাউকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। দলের কিছু নেতা মনে করছেন, প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত ‘সংগঠন’ বলতে রাজনৈতিক দলকে বোঝানো হয়নি। যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন মন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলও একটি সংগঠন এবং প্রজ্ঞাপনের শর্ত অনুযায়ী পদত্যাগ করা বাধ্যতামূলক। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জানিয়েছেন, সংগঠন বলতে যদি রাজনৈতিক দল বোঝায়, তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের পদত্যাগ করা উচিত, যদিও তিনি পুরো বিষয়টি এখনো জানেন না।
উল্লেখ্য, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ২৫ বিধিতে সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আজমত উল্লা খানের মতো নেতাদের দলীয় পদে থেকে সরকারি দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে। সরকারি চাকরি আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক যুগ্ম সচিব ফিরোজ মিয়ার মতে, সরকারি সংস্থার প্রধানের পদ কোনো জনপ্রতিনিধির পদ নয়, তাই এসব পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দলীয় পদ ত্যাগ করা জরুরি।

















