দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি চারটি টুথপেস্টের মধ্যে তিনটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) পরিচালিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে, অর্থাৎ ৭৬.৫ শতাংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে। এই গবেষণা প্রতিবেদনটি গত রোববার রাজধানীর লালমাটিয়ায় এসডোর প্রধান কার্যালয়ে প্রকাশ করা হয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই (৬৬.৭%) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এসব টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ১৪০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এর আগে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা নিয়মিত নজরদারি ছিল না। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে এসডো ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী একটি সমন্বিত গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণায় ভোক্তা জরিপ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং নিয়ন্ত্রক ও বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশে এই ধরনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এই প্রথম, যা ভবিষ্যতে নিরাপদ টুথপেস্ট নিশ্চিত করতে মানদণ্ড নির্ধারণ, নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গবেষণায় দেশের বিভিন্ন এলাকার ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। পাশাপাশি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি (ইএইচই)’ ল্যাবরেটরিতে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষা করা ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে (৭৬.৫%) মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যেখানে ৮টিতে (২৩.৫%) কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল না। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত পাওয়া গেছে। পরীক্ষা করা টুথপেস্টগুলো বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে উৎপাদিত হয়েছে এবং চারটি দেশের উৎপাদিত টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের ৫টির মধ্যে একটিতে, থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে একটিতে এবং ভিয়েতনামের ২টির দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। একটি টুথপেস্টে প্রতি ১০০ গ্রামে সর্বোচ্চ ৩২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা মিলেছে।
দেশে তৈরি ও আমদানি করা উভয় ধরনের টুথপেস্টেই মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পরীক্ষা করা কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা কৃত্রিম পলিমার ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ ছিল না। ফলে ভোক্তারা যেমন তাদের ব্যবহৃত পণ্য সম্পর্কে অবগত নন, তেমনই নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্যও এই পণ্যগুলো পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভোক্তাদের সচেতনতার অভাবও গবেষণায় উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সবাই নিয়মিত টুথপেস্ট ব্যবহার করলেও ৪১.৯ শতাংশ মানুষ জানতেনই না যে টুথপেস্টের মতো মুখের পরিচর্যার পণ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। মাত্র ২৬.৯ শতাংশ উত্তরদাতা এ বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন।
এসডো স্পষ্ট করেছে যে, এই গবেষণার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা নয়। বরং বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে কোনো জাতীয় মানদণ্ড, গ্রহণযোগ্য সীমা, পরীক্ষার নির্দেশিকা বা লেবেলে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে তুলে ধরাই ছিল মূল লক্ষ্য। এই গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে একটি জাতীয় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
এসডো জানিয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। এটি পানি ও মাটির মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ ও শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে স্বাস্থ্যগত নানান জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, ‘ভালো নীতিমালা গড়ে ওঠে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে। বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যা ভবিষ্যতে মানদণ্ড প্রণয়ন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
এসডোর মহাসচিব ও সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘টুথপেস্ট আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহারের একটি পণ্য। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, এতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে— এ বিষয়টি সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই জানেন না। তাই আরও গবেষণার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পণ্যের লেবেলে উপাদানের স্পষ্ট তথ্য উল্লেখ এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি এখন অত্যন্ত জরুরি।’
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, ‘এই গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক শূন্যতা পূরণ হয়েছে। এর ফলাফল ভবিষ্যতে ওরাল কেয়ার পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড নির্ধারণ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক হবে।’
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিজিএমই) সাবেক লাইন ডিরেক্টর (এমই ও এইচএমডি) অধ্যাপক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার বলেন, ‘আমাদের মুখ পরিষ্কারে ব্যবহৃত পণ্যগুলোতে এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থাকা মোটেও উচিত নয়। দাঁতের সুরক্ষায় ফ্লোরাইড, কার্বনেট ও সিলিকাকে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মনে করা হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক তার ঘর্ষণ ক্ষমতার কারণে দাঁত সাদা করতে পারলেও এটি দাঁতের এনামেলের ওপর অত্যন্ত বিরূপ ও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।’
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)-এর উপ-পরিচালক মো. মনজুরুল করিম বলেন, ‘টুথপেস্ট তৈরির স্ট্যান্ডার্ড ও প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে অনুমোদিত ৪০টি উপাদানের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এই তালিকায় এখনো মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আমরা এই বিষয়টি আমলে নিচ্ছি এবং দ্রুতই এসআরও সংশোধন করে তালিকায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানদণ্ড বা সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা যুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের ইন্সপেক্টর মাহমুদা তামান্না খান বলেন, ‘আজ যে বিষয়টি উন্মোচিত করেছি, তার ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী এবং বিএসটিআইকে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত।’
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জাতীয় মানদণ্ডের অভাব, নিয়মিত বাজার তদারকির সীমাবদ্ধতা এবং পরীক্ষাগারের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এসব ঘাটতি দূর করতে বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান ভোক্তা সুরক্ষা ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়টি যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

















