সম্প্রতি রাজধানীতে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতিতে কালি লেপন এবং এর জেরে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়েরের ঘটনাকে দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত আখ্যা দিয়েছেন লেখক। তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি, সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী এবং প্রয়াত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টেনে এনে ভিলেন বানানোর প্রচেষ্টাকে ‘অকাট মূর্খতা’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রতিকৃতিতে কালি লেপনের মতো ঘটনায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়াকে আইনের চরম অপব্যবহার বলেও তিনি মন্তব্য করেন। আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের এক অসামান্য প্রতিভা, যা অস্বীকার করাকে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের মতো ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দানবীয় মানসিকতার প্রকাশ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই অযথা টানাটানি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এবং কিছু ‘অতি বাঙালি’ প্রজন্ম শুরু করেছিল। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সে সময় মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতি অতি ভক্তির বিস্তার ঘটে। ষাটের দশকে ঢাকায় শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি ঝোলানো দেখা যেত এবং বৈশাখী মেলায় তার আদলে তৈরি মাটির মূর্তি বিক্রি হতো, যা দেখে মানুষ আমোদ পেত। পাকিস্তানি আমলে রবীন্দ্রপ্রেম আরও গাঢ় হয়.
লেখক প্রশ্ন তোলেন যে, বাঙালি আবেগের বশবর্তী হয়ে ইতিহাস অসচেতন শেখ মুজিবুর রহমান সংগীত রচনার কোনো ইতিহাস না জেনে, বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বানিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে লেখা এই গানটি ১৯৪৮ সালের পাকিস্তান আন্দোলন এবং ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাজনের পর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ খণ্ডিত রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত হিসেবে ১৯৭২ সালে গ্রহণ করা হয়। এই পুরো ঘটনায় কবির অপরাধ কী, এই প্রশ্ন উত্থাপন করে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেখ মুজিবকে তার গানকে জাতীয় সংগীত বানাতে বাধ্য করেননি.
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত-সংক্রান্ত এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। তিনি বিশ্বের কয়েকটি দেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদাহরণ তুলে ধরেন। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর পুরোনো জাতীয় সংগীত বাতিল করা হয়েছে। ২০০৪ সালে আফগানিস্তানের জাতীয় সংগীতে একাধিক ভাষার পঙ্ক্তি যুক্ত করে বিভিন্ন জাতির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ২০১২ সালে অস্ট্রিয়ায় নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংগীতে ‘Great Sons’-কে ‘Great Daughters and Sons’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে, ২০১৮ সালে কানাডায় লিঙ্গ-নিরপেক্ষ করার জন্য একটি বাক্য বাদ দেওয়া হয়েছে, এবং ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ আদিবাসী ইতিহাসকে বিলম্বে হলেও স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য কয়েকটি মাত্র শব্দের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করা হয়েছে। ইংল্যান্ডে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে জাতীয় সংগীতে একটি ছোট পরিবর্তন নিয়মিতভাবেই করে যেতে হয়। তাদের জাতীয় সংগীতে ‘God save the King অথবা Queen’, এই পরিবর্তনটুকু নির্ভর করে সিংহাসনে পুরুষ অথবা নারী কে বসে আছেন তার ওপর। আমাদের ক্ষেত্রে কবি পছন্দ হচ্ছে না শুধু এই কারণে জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা হলে তাতে জাতির ইজ্জত বাড়বে না বলেই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। নাইজেরিয়ার মতো মূর্খ, দুর্নীতিপরায়ণ নেতাদের ইচ্ছায় নতুন জাতীয় সংগীত করে আবার পুরোনোটায় ফিরে যাওয়ার মতো আজগুবি পরিস্থিতি এ দেশে যেন না হয় সেটাই কামনা করি।
রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা অসামান্য এবং তার সাহিত্য বাঙালি হিসেবে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, উল্লেখ করে লেখক বলেন, তিনি যখন তার সাহিত্য পাঠ করবেন তখন তিনি জমিদার ছিলেন নাকি প্রজা ছিলেন, তা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি পূর্ববঙ্গে তার জমিদারির সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের নিয়ে লেখেননি শতবর্ষ পরে সেই নালিশ করেও আজ কোনো ফায়দা নেই। রবীন্দ্রসাহিত্যের মূল্যায়ন করতে তিনি বসেননি, তবে তিনি মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প লেখক। তিনি রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গেই কয়েকটি কথা বলতে চান.
লেখক অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে দেশে ইসলামোফোবিয়াকে উৎসাহিত করেছে। উপরন্তু, এই শ্রেণির একটি অংশ বাংলাদেশে বাস করেও অখণ্ড ভারত তত্ত্বে বিশ্বাসী থেকেছেন এবং ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দায়ী করে পাকিস্তান রাষ্ট্র ও জিন্নাহর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছেন। কালক্রমে ভারতে হিন্দুত্ববাদ বিকশিত হলে, ভারতপ্রেমে অন্ধ হয়ে এই গোষ্ঠী বাংলাদেশেও হিন্দুত্ববাদের ‘ফুট সোলজার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সরাসরি ইসলামবিরোধিতা করতে না পেরে তারা একধরনের সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ কায়েম করার দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এবং পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের আসমানে তুলতে গিয়ে পাকিস্তানপন্থার অভিযোগ তুলে ফররুখ আহমদের মতো মহান কবিকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে চরম নিগৃহীত ও অপমানিত হতে হয়েছে। এমনকি আপাদমস্তক ধর্মনিরপেক্ষ নজরুল ইসলামকেও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বাংলা বিভাগের পাঠক্রমে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। উদীচী, ছায়ানট ইত্যাদি সংগঠন বাংলাদেশকে সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের অধীনস্থ করার মিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আইকন হিসেবে ব্যবহার করেছে, ফলে সমাজের একাংশের মনে তার প্রতি বীতশ্রদ্ধা বিস্তার লাভ করেছে.
রবীন্দ্রনাথ ইসলামবিদ্বেষী ছিলেন কি না, এই বিতর্কে অংশগ্রহণ না করলেও লেখক তার লেখা থেকে নির্মোহভাবে বলতে পারেন যে, তিনি লেখালেখিতে তৎকালীন যুক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়, বাঙালি মুসলমানকে অবজ্ঞা করেছেন। সেই বাস্তবতায় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে উদীচী ও ছায়ানট জাতীয় আওয়ামী ও ভারতীয় বামপন্থি সংগঠনের রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাড়াবাড়ি অনুচিত হয়েছে। বাংলাদেশে তাকে ঋষি ও মহামানব বানানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। তথাকথিত সেক্যুলার গোষ্ঠী যদি হিন্দুত্ববাদী না হয়ে প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ হতেন, তাহলে সর্ববিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের জায়গায় কবি নজরুল ইসলাম তাদের আইকন হওয়া উচিত ছিল.
নজরুলের চার ছেলের নাম (কৃষ্ণ-মোহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, সব্যসাচী এবং অনিরুদ্ধ) উল্লেখ করে লেখক বলেন, এই নাম নির্বাচন থেকেই ব্যক্তি নজরুলের চিন্তাধারা উপলব্ধি করা যায়। কবি নজরুল একদিকে যেমন প্রচুর ইসলামি সংগীত রচনা করেছেন, অন্যদিকে হিন্দু দেবতা কালীকে নিয়ে তার শ্যামাসংগীতের সংখ্যাও কম নয়। নজরুলের শ্যামাসংগীতের দেবীবন্দনার সঙ্গে চরম ইসলামবিদ্বেষী এবং দিল্লির ক্ষমতাসীন বিজেপির বাঙালি আদর্শিক তাত্ত্বিক বঙ্কিমচন্দ্রের সাম্প্রদায়িক উপন্যাস ‘আনন্দমঠে’র ‘বন্দে মাতরম’ গানের দেবী অর্চনা মধ্যে বিশেষ কোনো ফারাক নেই। কোনো একেশ্বরবাদী মুসলমান ‘বন্দে মাতরম’ গানটি গাইতে পারে কি না, এ নিয়ে বর্তমানে ভারতে তীব্র বিতর্ক চলছে। নজরুলের শ্যামাসংগীতও তিনি কোনো মুসলমান নারী-পুরুষের কণ্ঠে শোনেননি। বিজেপি সরকার সম্প্রতি ‘বন্দে মাতরম’কে দেশটির জাতীয় সংগীতের সমতুল্য মর্যাদা দিয়েছে। অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ভাবধারার পূজাপর্বের সব চমৎকার গান লিখলেও ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে কখনো মাথা ঘামাননি। তার পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পুনরায় হিন্দুধর্মে প্রবেশ না করলেও হিন্দু সংস্কৃতির প্রতি তার যথেষ্ট শ্রদ্ধা ছিল.
মারাঠা নেতা শিবাজীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশাল কবিতা রচনা করলেও একমাত্র সম্রাট শাহজাহান ছাড়া তিনি আর কোনো ঐতিহাসিক কিংবা সমসাময়িক মুসলমান চরিত্রকে তার সাহিত্যে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেননি। শাহজাহানকেও তিনি কেবল তাজমহল নির্মাণ করার জন্য মহিমান্বিত করেছেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রসাহিত্যে বাকি মুসলমান চরিত্র হয় ভিলেন অথবা অনুল্লেখ্য। সুতরাং, বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের তথাকথিত সেক্যুলার হোতাদের কাছে এই প্রশ্ন যুক্তিসংগতভাবেই উত্থাপন করা যেতে পারে যে, কেন তারা নিখাদ সেক্যুলার নজরুলকে আইকন না বানিয়ে হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল রবীন্দ্রনাথকে বেছে নিয়েছেন? এর দায় অবশ্য সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পাণ্ডাদের, কোনোভাবেই সেটা মৃত রবীন্দ্রনাথের নয়.
পরিশেষে, রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে এ দেশে অবশ্যই সুস্থ বিতর্ক এবং একাডেমিক আলোচনা হওয়ার অবারিত সুযোগ রয়েছে। কিন্তু, তার অসাধারণ প্রতিভাকে অস্বীকার করার চেষ্টা অথবা তাকে অসম্মান করার ধৃষ্টতা জাতি হিসেবে কেবল আমাদের ছোটই করবে। পার্শ্ববর্তী আগ্রাসী দেশের বিজেপির কট্টর সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ঘৃণা করে আবার তাদের মতো আচরণ বাংলাদেশের বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশা করেন না তিনি। ঘৃণা দিয়ে কোনো মহৎ লক্ষ্য অর্জন করা যায় না, সাংস্কৃতিক লড়াই মেধা দিয়ে করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী এবং ১৯৪১ সালে প্রয়াত রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টেনে এনে অযথা ভিলেন বানানো যেমন আকাট মূর্খতা, তেমনি তার প্রতিকৃতিতে কালি লেপন করার অপরাধে একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়াও সরকারের আইনের চরম অপব্যবহার। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এত ঠুনকো করা হলে প্রকৃত রাষ্ট্রদ্রোহের সময় অতি উৎসাহী সরকার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি দেখতে পারেন। আমি দুই ঘটনারই নিন্দা করি।
রবীন্দ্রনাথের আত্মা নিশ্চয়ই হুমকি দেয়নি যে, আমার সোনার বাংলাকে জাতীয় সংগীত না বানালে শেখ মুজিবের ঘাড় মটকে দেবেন। শেখ মুজিবের সেই অবিবেচনার মূল্য এখন খামোখা বিশ্বের এক অন্যতম প্রধান কবিকে দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত-সংক্রান্ত এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের এবার অবসান হওয়া উচিত। আমি মাত্র চারটি দেশে জাতীয় সংগীতের মৌলিক পরিবর্তন খুঁজে পেয়েছি। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শাসনের অবসানের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সংগত কারণেই জাতীয় সংগীতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নাইজেরিয়ায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে জাতীয় সংগীত একবার পরিবর্তন করে আবার পুরোনোটায় ফিরে গেছে।

















