ইসলামে মানব পাচারকে দাসত্বের আধুনিক রূপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং এটিকে কঠোরভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের পরকালে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন তথ্যানুসারে, গত আট বছরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন প্রায় সাড়ে ২০ লাখ পাচার হওয়া মানুষ, যার মধ্যে নৌযান ডুবে মারা গেছেন ১৯ হাজারের বেশি। ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে কেবল ইউরোপেই ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ পাচার হয়েছে।
পাচার হওয়া নারী ও শিশু-কিশোরীদের পতিতাবৃত্তি, গৃহস্থালির কাজ এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করা হয়, এমনকি অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তিতেও লাগানো হয়। পুরুষদের মাদক ও অস্ত্র পাচার, চোরাচালান, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অমানবিক, অপরাধমূলক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হয়। এভাবে মানুষকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করা, উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে দাসে পরিণত করা এবং জীবনের ঝুঁকি নেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কিছু মানুষের অর্থ উপার্জনের লোভে হাজার হাজার পরিবারকে চিরস্থায়ী কান্নার কারণ হতে হচ্ছে।
যারা নিজেদের বিত্তশালী বানাতে মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছে, তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে। দুনিয়ার বিচার আদালতকে ফাঁকি দিতে পারলেও পরকালে আল্লাহর কাছে তাদের শাস্তি অবধারিত। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের প্রতিপক্ষ হব। আর আমি যার প্রতিপক্ষ, তার পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তাদের এক শ্রেণি হলো, যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করবে।’ (বোখারি : ২২২৭)।
সম্পদ উপার্জনের নেশায় যারা অন্যকে জিম্মি করে, আল্লাহ তাদের দুনিয়াকে অশান্তিময় করে দেবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে দুনিয়া অর্জন, আল্লাহ তার কাজকে এলোমেলো করে দেবেন, তার জন্য পেরেশানি সৃষ্টি করবেন এবং তার সামনে দারিদ্র্য এনে দেবেন, যদিও সে পৃথিবীর সম্পদ ততটুকুই পাবে, যতটুকু তার জন্য নির্ধারিত আছে।’ (ইবনে মাজাহ : ৪১০৫)।
মানব পাচারের ঘটনা কমছে না, কারণ এ সংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মানব পাচারের ঘটনায় ৬ হাজার ১৩৪টি মামলা হয়েছে এবং ১১ হাজার ৪৬০ জন অভিযুক্ত হয়েছে। তবে এসব মামলার মধ্যে মাত্র ২৩৩টি মামলায় ৪০৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায়।
যারা মানব পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনার দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অবহেলাও পরকালে বিচারের মুখোমুখি করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বোখারি : ৭১৩৮)।
মানব পাচারকে দাসত্বের আধুনিক রূপ বলা হয়। একটি জরিপে এসেছে, গত আট বছরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছে সাড়ে ২০ লাখ পাচার হওয়া মানুষ। এ সময় নৌযান ডুবে মারা গেছে ১৯ হাজারের বেশি মানুষ। (দৈনিক ইত্তেফাক : ১ এপ্রিল, ২০২২)। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া এবং সাগরে ডুবে যাওয়া মানুষের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাও কম নয়। ইউরোপীয় কমিশন বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে শুধু ইউরোপেই পাচার হয়েছে ৬৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। (বিবিসি বাংলা : ৩০ জুলাই, ২০২২)।

















