বিয়ে জীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ইসলামে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর দ্বিনদারি, স্বভাব-চরিত্র ও পারস্পরিক সামঞ্জস্য সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে, বর্তমান সময়ে অনেকেই বাগদান বা এনগেজমেন্টকে বিয়ের সমতুল্য মনে করে পাত্র-পাত্রীর অবাধ কথাবার্তা, দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বাগদানের পর তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে।
ইসলামে বিয়ের প্রস্তাবকে ‘খিতবা’ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নারীদের বিয়ের প্রস্তাবের ব্যাপারে তোমরা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বললে কিংবা তা নিজেদের অন্তরে গোপন রাখলে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ২৩৫)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বিয়ের প্রস্তাব ও বিয়ে এক বিষয় নয়। এমনকি বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলেও বিয়ের আকদ বা চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে পাত্র-পাত্রী কেউ কারো স্বামী বা স্ত্রী নয় এবং তারা পরস্পরের জন্য গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষ ও পরনারী হিসেবেই গণ্য হন। অতএব, বাগদানের মাধ্যমে শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও সম্পর্ক কার্যকর হয় না।
বাগদানের পর পাত্র-পাত্রীর নির্জনে দেখা করা, একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসা, ঘুরতে যাওয়া বা দীর্ঘ সময় একান্তে কথা বলা ইসলামে বৈধ নয়। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, এতে সমস্যা কী? এর জবাব হলো, নিকাহ বা বিয়ে এখনো সম্পন্ন হয়নি, আর এটাই মূল সমস্যা। এনগেজমেন্ট বা আংটি পরানো হলেও বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত মেয়েটি পরনারী হিসেবেই গণ্য হন। পরনারীর সঙ্গে একান্তে কথা বলা ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করবে না, যদি তার সঙ্গে কোনো মাহরাম (নিকটাত্মীয়) না থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩৪১)। অন্য এক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘সাবধান! কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করলে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২১৬৫)। অতএব, বাগদানের পর একান্ত সাক্ষাৎ কোনোভাবেই বৈধ হয়ে যায় না। (আদ-দুররুল মুখতার : ৮/৪২, ফতোয়া ওসমানী : ২/২২৯)।
বর্তমান সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসারের কারণে ফোন, মেসেঞ্জার ও ভিডিও কলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা, রাত জেগে চ্যাট করা এবং আবেগঘন বার্তা, ছবি ও ভিডিও আদান-প্রদান একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, এনগেজমেন্টের পর এই ধরনের যোগাযোগও ইসলামে বৈধ নয়। কারণ যোগাযোগের মাধ্যম পরিবর্তিত হলেও শরিয়তের মূলনীতি পরিবর্তিত হয়নি। মুখোমুখি বসে যেমন কথা বলা বৈধ নয়, তেমনি মোবাইলে লিখে বা বলে সেটিও বৈধ নয়। বিয়ের প্রতিশ্রুতির পর প্রযুক্তির মাধ্যমে তরুণ-তরুণীদের গোপন আলাপ বা চ্যাটিং মূলত হাদিসে বর্ণিত একান্ত সাক্ষাতেরই আধুনিক রূপ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : আল-ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩২)। এই আয়াতে শুধু ব্যভিচার থেকেই নিষেধ করা হয়নি; বরং তার কাছাকাছি যেতেও নিষেধ করা হয়েছে। কারণ বড় পাপ অনেক সময় ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমেই শুরু হয়। অতএব, শরীরে স্পর্শ, ফোন, মেসেঞ্জার ও ভিডিও কলে যোগাযোগ—এগুলো পরোক্ষভাবে জিনার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সমাজে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, ‘বাগদান হয়ে গেছে, এখন আর সমস্যা নেই।’ কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে বাগদানের দিন থেকে নয়, বরং নিকাহ বা বিয়ের পর থেকেই বৈবাহিক সম্পর্ক শুরু হয়। বিয়ে ছয় মাস পর হোক, এক মাস পর হোক কিংবা আগামীকাল, নিকাহ হওয়ার আগ পর্যন্ত পাত্র গায়রে মাহরাম এবং পাত্রী গায়রে মাহরাম। তাই নিকাহর আগে যে কাজ একজন অপরিচিত গায়রে মাহরামের সঙ্গে করা বৈধ নয়, শুধু বাগদান হওয়ার কারণে তা বৈধ হয়ে যায় না। (আদ-দুররুল মুখতার : ৮/৪২, ফতোয়া ওসমানী : ২/২২৯, ফতোয়া দারুল উলুম দেওবন্দ : ৭/১৩০, ইমদাদুল আহকাম : ৩/২০২)।

















