শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মাটির চুলার ধোঁয়ায় তৈরি চিতই পিঠা বাঙালির এক অবিচ্ছেদ্য স্মৃতির নাম। চালের গুঁড়ো ও পানির মিশ্রণে তৈরি ব্যাটার গরম তাওয়ায় পড়লেই ছোট ছোট ছিদ্র ফুটে ওঠে, যেন মাটি নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে। ঠিক হাজার মাইল দূরে বিলেতের কোনো এক শীতের সকালে রান্নাঘরের টেবিলে দেখা মেলে ক্রাম্পেটের। ময়দা, পানি বা দুধ এবং ইস্টের মিশ্রণে তৈরি এই খাবারের ছিদ্রগুলো কার্বন ডাই-অক্সাইডের বুদবুদ থেকে সৃষ্টি হয়। দুটি ভিন্ন খাদ্যসংস্কৃতির এই খাবারগুলো গরম তাওয়ার সামনে দাঁড়ালে যেন পৃথিবীটাকে একটু ছোট করে আনে।
খাদ্যরসিকদের কাছে চিতই পিঠা ও ক্রাম্পেট যেন রসায়নের এক একটি কবিতা। চিতই পিঠার মূল উপাদান চালের গুঁড়ো এবং পানি, যেখানে ইস্টের ব্যবহার সাধারণত হয় না। অন্যদিকে, ক্রাম্পেটের পরিচিত ছিদ্রযুক্ত গঠনের মূল কারিগর হলো ইস্টের কার্যকলাপে উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইড। তাওয়ার উত্তাপে দুটি খাবারই ধীরে ধীরে তাদের চূড়ান্ত রূপ পায়। ক্রাম্পেটের ছিদ্রগুলো মাখন ধরে রাখে, আর চিতই পিঠার সঙ্গে খেজুরের গুড়, নারকেল কিংবা দুধের মিশেলে তৈরি হয় ভিন্ন স্বাদের এক আরামদায়ক অনুভূতি।
চিতই পিঠা মানেই উঠোনে পরিবারের মানুষের আনাগোনা আর গরম পিঠার জন্য অপেক্ষা। আবার ক্রাম্পেট মানেই ব্রিটিশ সকালের নাশতা কিংবা বিকেলের চায়ের কাপের পাশে টোস্ট করা পিঠের ওপর গলে পড়া মাখনের সুবাস। দুটি খাবারই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে একটুখানি প্রশান্তি ও শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। মানুষের খাদ্যসংস্কৃতির ইতিহাসে তাওয়া এক প্রাচীন সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ার রুটি-দোসা থেকে শুরু করে মেক্সিকোর টরটিলা বা ফরাসি ক্রেপ—সবই উত্তপ্ত সমতল পৃষ্ঠে তৈরি হয়, যদিও তাদের উপকরণ ও প্রস্তুতপ্রণালিতে রয়েছে ভিন্নতা।
চিতই পিঠা আর ক্রাম্পেটের সৌন্দর্য তাদের অসম্পূর্ণতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। কোনোটি ছোট ছিদ্রযুক্ত, কোনোটি হয়তো অমসৃণ, তবুও প্রতিটি খাবারই স্বকীয়তায় অনন্য। ডাঃ এম আর করিম রেজা মনে করেন, মানুষের জীবনের অসম্পূর্ণতা ও অপ্রত্যাশিত মোড়গুলোই যেমন আমাদের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করে, তেমনি এই খাবারগুলোও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভিন্নতা মানেই দূরত্ব নয়। ইতিহাস, ভাষা ও রান্নাঘর আলাদা হলেও উষ্ণতার প্রয়োজন ও স্মৃতির টানে আমরা সবাই একই পৃথিবীর বাসিন্দা।

















