বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে পাপ বা অনৈতিক ঘোষণা করার পরেও যখন কেউ এই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখন প্রশ্ন ওঠে তিনি কি আসলেই খারাপ মানুষ? সমাজ ও ব্যক্তির সম্পর্কের জটিলতায় অনেক সময় মানুষ নিজের এই আচরণকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে বিভিন্ন অযুহাত খোঁজে। কেউ একে বিশেষ পরিস্থিতি বলে দাবি করেন, আবার কেউ শয়তানের প্ররোচনা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করেন। সমাজ চিন্তক ও গবেষক রঞ্জনা বিশ্বাসের মতে, এ ধরনের আচরণ অপরাধ প্রবণ মস্তিষ্কের পরিচয়।
আমাদের সমাজে মানুষ সবসময় একটি গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চায়, যা মূলত সামাজিক নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত। এই নিয়ম মেনে চললে মানুষ সুনাম, সম্মান ও নেতৃত্বের মতো সামাজিক পুরস্কার পাওয়ার আশা করে। কিন্তু এই ভাবমূর্তি গড়ার লড়াইয়ে মানুষ ভুলে যায় যে তার নিজস্ব কিছু চাহিদা ও সত্তা রয়েছে। আনন্দ, ঘনিষ্ঠতা, প্রেম ও যৌন তৃপ্তির মতো বিষয়গুলো একজন ব্যক্তির বাস্তব জীবনের অংশ। ফলে মানুষ প্রকাশ্যে নৈতিকতার কথা বললেও ব্যক্তিগত জীবনে নিজের আবেগের কাছে হেরে যায়। একজন ব্যক্তি নেতা বা স্বামী হিসেবে পরিচয় বহন করলেও তিনি শেষ পর্যন্ত একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, যার নিজস্ব যৌন সত্তা ও আবেগ রয়েছে।
ব্যক্তির এই বাস্তব সত্তা এবং আদর্শিক সত্তার মধ্যে প্রায়ই সংঘাত তৈরি হয়। বাস্তব সত্তা হলো মানুষের প্রকৃত অনুভূতি, কামনা, রাগ, ভয় ও সীমাবদ্ধতা। অন্যদিকে, আদর্শিক সত্তা হলো সমাজ বা অন্যের চোখে নিজেকে ভালো হিসেবে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা। যখন কেউ প্রকাশ্যে ধর্মীয় বা নৈতিক নিয়ম মেনে চলার দাবি করেন কিন্তু গোপনে তার বিপরীত কাজ করেন, তখন তার এই দুই সত্তার মধ্যে অমিল তৈরি হয়। যদি কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান, তবে তিনি মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় নির্মাণ করতে পারেন। কিন্তু অপরাধ গোপন করতে মিথ্যা গল্প তৈরি করলে তা প্রতারণায় রূপ নেয়।
গবেষক রঞ্জনা বিশ্বাসের মতে, মানুষ যখন নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করতে শুরু করে, তখনই ব্যক্তিত্বের সংঘাত তীব্র হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ তার আদর্শিক সত্তাকে টিকিয়ে রাখতে এবং একই সঙ্গে বাস্তব জীবনের গোপন অভিলাষ পূরণের জন্য দ্বৈত জীবন বেছে নেয়। অনেক দম্পতি সমাজকে আদর্শ দম্পতি হিসেবে দেখাতে গিয়েও পরকীয়ার আশ্রয় নেন, যা মূলত প্রতারণা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বা সামাজিক কাঠামোতে মানুষকে যোগ্যতার শর্ত দিয়ে বিচার করা হয়, ফলে তারা নিজেকে জানার চেয়ে শর্ত পূরণে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। এই কারণে আমাদের সমাজে ১৫ পাওয়া মানুষেরাও ৮০ পাওয়া মানুষের যোগ্যতা নিয়ে উপহাস করে, বলে সে কেন ১০০ পেল না! এই বাস্তব সত্তাকে অস্বীকার করার প্রবণতাই সমাজে ভণ্ডামি বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ তখনই শ্রেষ্ঠ হয় যখন সে নিজের কাজের দায়ভার নিতে শেখে এবং বিবেচনাবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়।

















