রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ভবনে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার সাড়ে ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) এখনো মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারীদের এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযোগপত্রও জমা দেওয়া যায়নি। অথচ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে মোট ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, যাদের সবাই এখন জামিনে মুক্ত। মামলার বর্তমান তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা নতুন আসামি শনাক্তের সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে হামলার ঘটনার পর প্রথম আট দিনে ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আরও ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সবশেষ জুলাই মাসে একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। ডিবির কর্মকর্তারা শুরু থেকেই হামলাকারীদের পাশাপাশি উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার কথা বললেও, দীর্ঘ ১০ মাসে ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করেও মূল ছককারীদের চিহ্নিত করা যায়নি। হামলার পেছনে রাজনৈতিক সহায়তা বা অর্থায়ন ছিল কি না, তাও এখনো অস্পষ্ট।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডার্ক ওয়েবের একটি গ্রুপকে কাজে লাগিয়েও নতুন কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, আসামিরা প্রথম ধাপে গ্রেপ্তারের পর ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট ডিলিট করে ফেলেছে। এছাড়া মোবাইল লোকেশন বা লিংকের অভাবে উসকানিদাতাদের অনেকের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ মিনহাজ উদ্দিন জানিয়েছেন, ঢাকার একটি মাদ্রাসার আরও ৬ জন ও ১৯ জনসহ মোট ২৫ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যদিও তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর পুড়িয়ে দেওয়া ভবন পরিদর্শনের সময় দুই মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও সেই নির্দেশনার প্রতিফলন ঘটেনি। এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান বলেন, হামলার অনেক তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা দুঃখজনক। তিনি দ্রুত উসকানিদাতা ও হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে আতাউর রহমান বিক্রমপুরী জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি বিবেচনায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর থেকে আটকাদেশে কারাগারে ছিলেন এবং গত ৩ এপ্রিল তাকে প্রথম আলোয় হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এছাড়া ভিডিও ফুটেজে কুড়াল হাতে উল্লাস করা মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম এবং ক্যামেরার সামনে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া কারি মুয়াজ বিন আবদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ১৫ জনকে প্রথমে ডেইলি স্টার ভবনে হামলার মামলায় এবং ৫ জনকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; পরে প্রথম আলোর মামলায়ও তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, বাকস্বাধীনতার ওপর এটি একটি জঘন্যতম আক্রমণ এবং তদন্তে তৎপরতার অভাব অপরাধীদের প্রশ্রয় দিতে পারে।

















