বাংলাদেশ

মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির আলোচনা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদক
সব খবর

দেশে চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার গ্যাসের নতুন উৎস সন্ধানে তৎপর। মালয়েশিয়া থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উদ্যোগের পর এবার মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি গ্যাস আমদানির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ এই প্রস্তাব দিয়েছে এবং মিয়ানমারও এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এই প্রস্তাবনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিষয় এখনো অস্পষ্ট।

কত গ্যাস পাওয়া যেতে পারে, কোন গ্যাসক্ষেত্র থেকে তা আসবে, পাইপলাইন কোন পথে নির্মিত হবে, এর ব্যয় ও নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। মিয়ানমারে গ্যাসের মজুত থাকলেও দেশটির উৎপাদন কমছে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলালে এটি দীর্ঘমেয়াদি উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে তার আগে গ্যাসের প্রাপ্যতা, মূল্য, পরিবহনের পথ ও অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন।

গত রোববার ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি পূরণে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন জ্বালানিমন্ত্রী। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত প্রস্তাবটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন এবং পাইপলাইনের পাশাপাশি এলএনজি হিসেবে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

মিয়ানমারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে গ্যাসের প্রমাণিত মজুত প্রায় ২২ লাখ কোটি ঘনফুট। দিনে উৎপাদন করে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুটের মতো। এই হিসাবে বর্তমান উৎপাদন অপরিবর্তিত থাকলে মজুত প্রায় ৪০ বছরের সমান। তবে দেশটি থেকে গ্যাসের উৎপাদন আগের চেয়ে কমেছে। ২০২১ সাল থেকে রাজনৈতিক সংকট ও অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে পড়ায় দুটি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি বিনিয়োগ ছেড়ে চলে গেছে।

ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, দেশে গ্যাসের সংকট রয়েছে এবং নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন টানা কমছে। মিয়ানমারে গ্যাস আছে, তাই এটি একটি উৎস হতে পারে। তবে তাদের সক্ষমতা আছে কি না, কত দাম হবে, কীভাবে আসবে—এগুলো বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মিয়ানমারে উৎপাদিত গ্যাসের ৫০ শতাংশ যায় থাইল্যান্ডে, ২৫ শতাংশ চীনে ও বাকি ২৫ শতাংশ নিজেরা ব্যবহার করে। দুটি দেশের সঙ্গেই তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে গ্যাস পাইপলাইনের আলোচনা প্রায় তিন দশকের পুরোনো। ১৯৯৭ সালে একটি বেসরকারি কোম্পানি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের ত্রিপুরায় পাইপলাইন করার প্রস্তাব দিয়েছিল, যা মূলত ভারতে গ্যাস রপ্তানির জন্য ছিল। এরপর ২০০৪ সালে তিন দেশের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয় এবং ২০০৫ সালে একটি কারিগরি কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু নেপাল ও ভুটান যেতে ভারতের ট্রানজিট সুবিধা চেয়েছিল বাংলাদেশ, যা ভারত রাজি না হওয়ায় ওই উদ্যোগ বাতিল হয়ে যায়। এখন আবার নতুন করে বাংলাদেশ নিজেই গ্যাস আনতে চায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্থিতিশীল নয়। স্থল পাইপলাইন নির্মাণ ও পরিচালনা করতে হলে আরাকান আর্মির সঙ্গে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া প্রকল্পটি এগোনো প্রায় অসম্ভব। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিরোধও বিদ্যমান। দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতি–বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে কার্যত মিয়ানমারের সীমান্ত নেই, প্রায় পুরোটাই আরাকান আর্মির হাতে। দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা ছাড়া পাইপলাইন করা কঠিন এবং যেকোনো সময় হামলা হতে পারে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে করা হলে তা ভিন্ন কথা।

২০১৭ সাল থেকে নিয়মিত কমছে গ্যাসের উৎপাদন। গত ৯ বছরে উৎপাদন কমেছে দিনে ১০৫ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ১৬৫ কোটি ঘনফুট। অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করছে বাংলাদেশ।

অথচ ২০১৬-১৭ সালের দিকে দিনে প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করত মিয়ানমার।.মিয়ানমারে গ্যাস আছে, তাই এটি একটি উৎস হতে পারে।

এবার বাংলাদেশ নিজেই গ্যাস আনতে চায়।২০০৭ সাল থেকে দেশে গ্যাসের সংকট শুরু হয়।

সব খবর