রাজনীতি

রাষ্ট্রপতি কি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হন? মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন ঘিরে নতুন আলোচনা

প্রতিবেদক
সব খবর

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলো রাষ্ট্রপতি। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতা পরিচালনা করলেও, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান এবং ঐক্যের প্রতীক। তবে, একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ যখন এই পদে বসেন, তখন তার রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে কিনা বা তিনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যান কিনা, এই প্রশ্নটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় ১৬ বছর ধরে দলের শীর্ষ পদে থেকে আন্দোলন, কারাবরণ এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় সক্রিয় থাকা মির্জা ফখরুলের বঙ্গভবনে যাওয়াকে একজন রাজনৈতিক যোদ্ধার নীরব হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলি সুনির্দিষ্ট। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা থাকলেও, পরবর্তীতে নানা সংশোধনীতে এর পরিবর্তন আসে। ১৯৯১ সালে একাদশ ও দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত থাকে।

সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্রের সকল নির্বাহী কাজ তার নামেই সম্পন্ন হয়। তবে, ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। বাকি সকল ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হয়, যা ৫৬(৩) অনুচ্ছেদেও উল্লেখ আছে। সংসদ আহ্বান, স্থগিত, ভেঙে দেওয়া, বিলে সম্মতি, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো প্রায় সব বিষয়েই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মানতে বাধ্য। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন কিনা, তা আদালত প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে না।

সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন এবং দুই মেয়াদের বেশি থাকতে পারেন না। তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। পদ শূন্য হলে বা অসমর্থ হলে স্পিকার দায়িত্ব পালন করেন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের দায়ে সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করার বিধানও রয়েছে (অনুচ্ছেদ ৫২)।

রাষ্ট্রপতি পদকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ রাখতে সংবিধানে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতি কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য নন এবং তিনি সংসদ সদস্য থাকলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের দিন তার আসন শূন্য হয়ে যায়। এর মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রপতিকে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের দৈনন্দিন দলীয় কোন্দল, বিতর্ক ও দলাদলি থেকে দূরে রাখা, যাতে তিনি দলমত নির্বিশেষে জাতির অভিভাবক হতে পারেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির চেয়ার কখনোই সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল না। স্বাধীনতার পর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও সামরিক ফরমানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন ছিলেন। ১৯৭৮ সালে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন।

১৯৯১ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ ভোটে নির্ধারিত হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি দলীয় প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তিনি তার মেয়াদকালে ১৯৯৬ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন এবং চাইলে সংসদ ভেঙে দিতে পারতেন, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে তা করেননি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে, যিনি নিরপেক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ ছিলেন। তিনি সরকারের তোষামোদ না করে সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তবে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাংবিধানিক ও নৈতিক অবস্থান সংকটে পড়ে। তিনি শেখ হাসিনাকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিলেও, তার পদত্যাগপত্র না থাকার মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দেয়। এছাড়াও, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন এবং স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির শূন্যপদ পূরণের জন্য ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেন।

১৩ই আগস্ট দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠক কক্ষে এই ঘোষণা আসে। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুলের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন।

মির্জা ফখরুলের এই মনোনয়ন বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় রাজনীতিতে এক সুগভীর কাঠামোগত রূপান্তর। তিনি ২০১১ সাল থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে মহাসচিব নিযুক্ত হয়ে প্রায় ১৬ বছর ধরে দলের হাল ধরেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের নির্বাসনের সময় তিনি দলের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছয়বার কারাবরণ করেছেন এবং সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন।

সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই মির্জা ফখরুলকে তার মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে মন্ত্রিসভা থেকেও পদত্যাগ করতে হবে এবং সংসদে তার আসন শূন্য ঘোষিত হবে। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হতে যাচ্ছে; সর্বশেষ ১৯৯১ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল। ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে। তবে, বর্তমান সংসদে বিএনপি’র নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, যা গাণিতিকভাবে নিশ্চিত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো একজন সক্রিয় রাজনীতিক যখন বঙ্গভবনে প্রবেশ করবেন, তখন তার প্রাত্যহিক রুটিন সম্পূর্ণ বদলে যাবে। তিনি দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন বা বিরোধী দলের সমালোচনা করবেন না। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটি ‘রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা’ মনে হলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ‘রাজনৈতিক উত্তরণ’। এটি দলীয় রাজনীতি থেকে ‘নিরপেক্ষ’ বা নির্দলীয় অবস্থানে উন্নীত হওয়া। একজন রাজনীতিবিদের জন্য এটি একটি বিরাট মানসিক ও কাঠামোগত রূপান্তর।

যদি মির্জা ফখরুল দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো জাতির অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তবে তার এই আপাত “নিষ্ক্রিয়” পদটিই রাষ্ট্রের শক্তিশালী নৈতিক ঢাল হয়ে উঠবে। প্রয়োজনের সময়ে তিনি সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ত্রাতার ভূমিকা পালন করতে পারবেন।

“রাষ্ট্রপতি হলে কি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে হয়?” এই প্রশ্নের উত্তর হলো ‘না’। রাষ্ট্রপতি হওয়া মানে একজন রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ারের মৃত্যু নয়, বরং তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ, পরিশীলিত এবং নিরপেক্ষ পর্যায়। একজন সাধারণ রাজনীতিক দলের স্বার্থে ও আগামী নির্বাচনের কথা ভেবে কাজ করেন; কিন্তু একজন রাষ্ট্রপতি কাজ করেন সমগ্র রাষ্ট্রের স্বার্থে এবং আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে।

সব খবর