রাজনীতি

মির্জা ফখরুল হচ্ছেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি

প্রতিবেদক
সব খবর

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। দলীয় সূত্রমতে, তিনি রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় নিশ্চিত।

রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলের স্থায়ী কমিটির এক বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমাদের দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হয়েছেন দলের সংগ্রামী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।’

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন বলে রিজভী জানান। এর আগে গত ১ আগস্ট বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব তারেক রহমানের ওপর অর্পণ করা হয়েছিল।

প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব পাওয়ার পর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে মতামত গ্রহণ করেন। সবার মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম জানাতে বৃহস্পতিবার বৈঠক ডাকা হয়। এতে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ নেতারাও অংশ নেন। বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র নির্বাচন ভবনে জমা দেওয়া হয়, যা ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।

সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকায় ভোট হয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবার বিরোধী জামায়াত জোট প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিরোধী ১১ দলীয় ঐক্য এলডিপি প্রেসিডেন্ট অলি আহমদকে তাদের প্রার্থী করেছে।

আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবং বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় অনেকটাই নিশ্চিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তারা বলেন, তিনি দল ও দেশের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন এবং দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রশ্নাতীত। বক্তৃতায় সতর্ক, সাদা মনের মানুষ এবং পরিশীলিত, মার্জিত, নম্র ও বিনয়ী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আগামীর মহামান্য হিসেবে দেখছেন তারা।

দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালনকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্লোভভাবে দলের জন্য কাজ করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগ তাঁকে স্পর্শ করেনি। দলের প্রতি তাঁর এমন ত্যাগের দৃষ্টান্ত সমসাময়িক রাজনীতিতে বিরল। বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময়ে দলকে সংগঠিত রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৭ সালের পটপরিবর্তনের পর এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে খন্দকার দেলোয়ারের মৃত্যুর পর থেকে তিনি দলের মহাসচিব হিসেবে রাজপথের আন্দোলন, মামলা-মোকদ্দমা ও সাংগঠনিক চাপ সামলেছেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবনে দলের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুল ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ। তিনি তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি সমন্বয়েও সক্রিয় ছিলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং ১৯৮৬ সালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেছেন। ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি দলের চরম দুঃসময়ে হাল ধরে রেখেছিলেন। শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নের মুখে তিনি প্রায় ৬ বার কারাবরণ করেছেন এবং শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এক শর কাছাকাছি মামলা দেওয়া হয়েছে, যার বেশির ভাগই রাজনৈতিক সহিংসতার।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একসময় কৃষক দলের সভাপতি ছিলেন। ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১৮ সালে বগুড়া-৬ আসন থেকে জিতলেও এমপি হিসেবে শপথ নেননি এবং পরবর্তীতে এই আসনে উপ-নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী রুমিন ফারহানাকে জিতিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ করে দেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন এবং সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে গ্রেফতার ও কারাবরণ করতে হয়।

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। তাঁদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকায় একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

তাঁর ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী, রাজনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপির রাজনীতিবিদ ছিলেন এবং ভূমিমন্ত্রী (১৯৭৮-৭৯), আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী (১৯৯১-৯৬) এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার (১৯৭৯-৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর প্রবাসী সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য যুব শিবির অধিদফতরের প্রধান মনোনীত হয়েছিলেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এখন তাকে রাষ্ট্রপতি পদে নেওয়ার আলোচনা সামনে আসায় দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে বিএনপির মহাসচিব। এর আগে তিনি ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে আলমগীরকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আলমগীর তার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সব খবর