দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান খেলাপি ঋণ কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং সুশাসন এবং দীর্ঘদিনের ঋণসংস্কৃতির গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। চলতি বছরের জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এই খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে খেলাপি হলো তার উত্তর খুঁজতে গেলে গত দেড় দশকের ব্যাংকিং পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হয়। রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, দুর্বল যাচাই-বাছাই এবং কাগুজে প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ বিতরণের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংক খাতে আলোচিত ছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন মাসে সেই অংক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক চিত্র সামনে আসায় এখন খেলাপি ঋণের হিসাব আরও বড় আকারে প্রকাশ পাচ্ছে।
খেলাপি ঋণের এই সাম্প্রতিক বৃদ্ধির পেছনে কেবল সুদ যুক্ত হওয়াকে দায়ী করলে চলবে না। মূল ঋণের টাকা কোথায় গেল এবং উৎপাদন বা বিনিয়োগের জন্য নেওয়া অর্থ কেন ফেরত আসছে না—সেটিই বড় প্রশ্ন। ব্যাংকের টাকা মূলত আমানতকারীদের অর্থ, তাই এই ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ আমানতকারী ও রাষ্ট্রের ওপরই পড়ে। পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা প্রয়োজন; প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া গ্রাহকদের সুযোগ দেওয়া যৌক্তিক হলেও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বারবার সুবিধা দেওয়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।
ব্যাংক একীভূতকরণ নিয়ে যে উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তাও সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। দুর্বল ব্যাংককে সবল ব্যাংকের সাথে যুক্ত করার পাশাপাশি অনিয়মের দায়, ক্ষতির উৎস এবং ঋণখেলাপিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনটি বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বড় খেলাপিদের সম্পদ শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ঋণ আদায় করা। দ্বিতীয়ত, অনিয়মের সাথে জড়িত ব্যাংকার, পরিচালক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
এছাড়া খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। সমস্যা আড়াল করে ব্যাংক খাতকে কাগজে-কলমে ভালো দেখানোর চেষ্টা সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। খেলাপি ঋণের এই পাহাড় ভাঙতে না পারলে অর্থনীতির ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে, যা নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে। ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রণ, দক্ষ পরিচালনা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সময়ের দাবি। জনগণের আমানত রক্ষায় এই সংকট নিরসনে কোনো আপস করার সুযোগ নেই।

















