চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার বাদী নায়কের মামা আলমগীর কুমকুমকে তার ভাই শাহরানকেও সালমান শাহর স্টাইলে হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এই হুমকিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে। গতকাল বুধবার ঢাকার আদালতে এসে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান আলমগীর কুমকুম। একই দিনে, চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আদালত।
ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি আশরাফুল হক ডনের জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এই শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন আলমগীর কুমকুম। শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের একটি স্ক্রিনশট দেখান, যেখানে এই হুমকি বার্তাটি ছিল।
সালমানের ভক্ত হিসেবে পরিচয় দেওয়া ‘মামুন’ নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক লাইভের কমেন্টে ‘শাকিল কিবরিয়া (Shakil Kibria)’ নামে একটি আইডি থেকে এই হুমকি দেওয়া হয়। বার্তায় লেখা ছিল, “মামুন, নীলা চৌধুরীকে বলো সালমানের মৃত্যু নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। তা না হলে আমরা যেভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছি, সেভাবে শাহরানকে (সালমান শাহর ভাই) হত্যা করবো।”
আলমগীর কুমকুম জানিয়েছেন, এই হুমকির ঘটনায় তিনি রমনা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করবেন, কারণ সালমান শাহ হত্যা মামলাটি রমনা থানাতেই দায়ের করা হয়েছিল। শুনানিতে ডনের আইনজীবী তারিকুল ইসলাম জুয়েল জামিনের আবেদন করেন, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী এর বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ডনের জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন।
এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন সালমান শাহর সেই ‘ভক্ত’ মামুন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সালমান ভক্তদের নিয়ে মানববন্ধন করার আহ্বান জানাতে তিনি ফেসবুকে লাইভ করছিলেন। সেই লাইভের কমেন্টেই এই হত্যার হুমকি দেওয়া হয়, যা পরে মুছে ফেলা হয়। মামুন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আবেদন জানান, সালমান ভক্তরা ৩০ বছর ধরে বলে আসছেন যে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। ডনকে গ্রেপ্তারের পর কেন এমন হুমকি আসছে, তা তদন্ত করে দেখা এবং মামলায় জড়িত অন্যদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত রোববার ডনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালত চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন সামিরার মা লতিফা হক লিও, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম এই মামলাটি দায়ের করেন। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চিত্রনায়ক সালমান শাহ ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে মারা যান।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেন। তবে পরে ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি অভিযোগটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন। আদালত তখন অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, সালমান শাহ ‘আত্মহত্যা’ করেন। সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন এবং ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়।
এর দীর্ঘ ১১ বছর পর, ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন, যেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান এবং ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, এরা তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। মামলাটি এরপর তদন্ত করে র্যাব। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির মুখে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত র্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।
এরপর সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। এ বিষয়ে সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়। পিবিআই ২০২০ সালে এ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, তখন ডন বলেছিলেন, “আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম।”
তিনি আরও বলেছিলেন, “২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার পূরণ কিছুতেই হবে না। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনো দিন মিথ্যা হয় না। মিথ্যাকেও কোনো দিন জোর করে সত্যি বানানো যায় না।” সেই বক্তব্য দেওয়ার ছয় বছর পর সালমান শাহ হত্যা মামলাতেই গ্রেপ্তার হলেন ডন।
এছাড়া, গত ২০ মে ‘হত্যার’ প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সালমানের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২৪ মে দেহাবশেষ উত্তোলন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও পুনরায় ময়নাতদন্ত করার অনুমতি দেওয়া হলেও বাদীপক্ষ লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করে, যা আদালত নথিভুক্ত করেন। গত ২২ জুন সালমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে কবর থেকে তার দেহাবশেষ উত্তোলন প্রক্রিয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয় এবং সিলেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা একটি অফিস আদেশ জারি করেন। ওই আদেশের অনুলিপি সম্প্রতি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হলে তা নথিভুক্ত করা হয়।
এরপর আবার সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। এ বিষয়ে সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়। পিবিআই ২০২০ যখন এ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, ডন তখন বলেছিলেন, “আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম।”

















