দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করার লক্ষ্যে জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতির গতি সচল রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে মজুত সক্ষমতা ৬০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৭১ দিনে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা ৯০ দিনে উন্নীত করা হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নতুন ডিপো নির্মাণ, অব্যবহৃত ট্যাংক সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত ট্যাংক ভাড়ার মতো কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, বর্তমানে দেশে ৬০ দিনের বেশি জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা ৭১ দিনে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে ৯০ দিনে উন্নীত করার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। জাতীয় জ্বালানি নীতি-১৯৯৬ অনুযায়ী ৬০ দিনের মজুতের বিধান থাকলেও, বর্তমান বাস্তবতায় এটি ৯০ দিনে উন্নীত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই।
জ্বালানি বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে মোট ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বিপিসির আওতাধীন ছয়টি কোম্পানির মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ১৫ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬ টন, যার মধ্যে ৬৭ হাজার ৬৩২ টন ধারণক্ষমতার অবকাঠামো সংস্কারের কাজ চলছে। বিপিসির নিজস্ব সক্ষমতায় বর্তমানে ডিজেল ৫৭ দিন, অকটেন ৪৬ দিন, পেট্রোল ২৯ দিন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৮ দিনের মজুত রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ট্যাংক ভাড়ায় ব্যবহারের মাধ্যমে এই সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিআরটিসি-এর মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত ট্যাংক এবং বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮২ হাজার ২০০ টন ধারণক্ষমতার মজুদাগার সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) জন্য দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার টন, যার মাসিক গড় চাহিদা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৫০ টন (৭৫০)। এছাড়া ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন, জেট ফুয়েলের ৬ লাখ ৬৩ হাজার টন, অকটেনের ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯০০ টন (৯০০) এবং পেট্রোলের ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টন (৫০০)। জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বিদ্যুৎ ও রেলওয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তিন মাসের তেল কিনে মজুত রাখে, তবে নতুন কোনো প্রকল্প ছাড়াই সামগ্রিক মজুত ১২ থেকে ১৩ দিন বেড়ে যাবে। এছাড়া ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের আওতায় পার্বতীপুর ডিপোর কমিশনিং সম্পন্ন হওয়ায় মজুত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৩৭ টন বেড়েছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ভৈরব ও সিলেটের বিভিন্ন ডিপোতে নতুন ট্যাংক নির্মাণ এবং বিদ্যমান ট্যাংকগুলোকে ডিজেল সংরক্ষণের উপযোগী করার কাজ চলমান রয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন জমি অধিগ্রহণের চেয়ে অচল ট্যাংক সচল করা ও বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করা সরকারের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
নারায়ণগঞ্জের মেঘনা পেট্রোলিয়ামের গোদনাইল ডিপোতে ১১ হাজার টন ধারণক্ষমতার দুটি নতুন ট্যাংক এবং ফতুল্লার আলীগঞ্জ ডিপোতে ১৩ হাজার টন ধারণক্ষমতার আরও দুটি ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গোদনাইলে ১ হাজার ৪৫০ টন ধারণক্ষমতার একটি এইচওবিসি ট্যাংক নির্মাণাধীন রয়েছে।
সিলেটের পদ্মা অয়েল ডিপোর ১ হাজার ৩৭ টন ধারণক্ষমতার তিনটি জেট ফুয়েল ট্যাংক ডিজেল সংরক্ষণের উপযোগী করা হচ্ছে। ভৈরব বাজার ডিপোতে ২ হাজার ১৬৫ টনের পাঁচটি ট্যাংক নির্মাণকাজ চলছে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওমেরা’র ৪০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ট্যাংকের মধ্যে ৩০ হাজার টন ভাড়ায় নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বিপিসি।

















