পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মানুষ নানা দুর্যোগ-বিপর্যয়, দুঃখ-কষ্ট, ক্ষুধা, অসুস্থতা এবং আর্থিক অসচ্ছলতায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের এই চরম দুরাবস্থা অনেক সময় আকাশ-বাতাসকে ভারি করে তোলে। দুঃখজনকভাবে, তথাকথিত মানবতাবাদী সুশীল সমাজ প্রায়শই তাদের পাশে দাঁড়ায় না, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর বা দু’মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে না। অথচ ইসলাম মানবকল্যাণ সাধনের জন্য মানুষের অস্তিত্বের কথা বলে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘তোমরা সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। মানবতার কল্যাণে তোমাদের অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।
মানবতার চিরকল্যাণকামী প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনে মানবসেবা ও প্রাণীর সেবার এক উজ্জ্বল আদর্শ স্থাপন করেছেন। তিনি সবসময় বঞ্চিত, আক্রান্ত ও পীড়িতদের প্রতি গভীর মমতা, নিখাদ ভালোবাসা ও পরম সহানুভূতি প্রদর্শন করতেন। বিপদাপদে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁর সহধর্মিণী খাদিজাতুল কোবরা (রা.) নবীজিকে (সা.) সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহতায়ালা আপনাকে কখনও অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি তো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রাখেন, অসহায়দের ভার বহন করেন, অসহায়কে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের পথে বিপদগ্রস্তদের সহযোগিতা করেন।’ (বোখারি : ৩)।
পার্থিব জীবনে মানুষের জীবন সবসময় সুখময় থাকে না; কখনও তা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে ওঠে। এমন কঠিন সময়ে যখন ধনী, এমনকি রক্তের আত্মীয়রাও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আল্লাহতায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ লাভের মাধ্যম। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ঈমানদারের একটি পার্থিব কষ্ট লাঘব করবে, আল্লাহতায়ালা তার কেয়ামত দিবসের একটি কষ্ট লাঘব করবেন। যে ব্যক্তি (লেনদেনে) কোনো অভাবী মানুষকে ছাড় দেবে, আল্লাহতায়ালা ইহ-পরকালে তাকে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহতায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে।’ (মুসলিম : ২৬৯৯)। তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা দয়ালুদের ওপর দয়া করেন। যারা জমিনে বসবাস করছে, তাদের প্রতি তোমরা দয়া কর; তাহলে যিনি আকাশে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (তিরমিজি : ১৯২৪)।
মোমিনদের প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একনিষ্ঠভাবে হওয়া উচিত। লোক দেখানো বা লৌকিকতাপূর্ণ আমলের পরকালে কোনো মূল্য নেই। বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমেই প্রতিটি কাজ ইবাদতে পরিণত হয়। তাই দান অবশ্যই ইখলাস ও বিশুদ্ধ নিয়তের সঙ্গে করতে হবে, অন্যথায় তা অন্তঃসারশূন্য বিবেচিত হবে। মানুষের বাহবা অর্জন বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কৃত আমল জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। (মুসলিম : ৪৮১৭)।
মানবসেবা হতে হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা, তারা তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে সাহায্য করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও বন্দিদের খাবার দান করে। (আর তাদের বলে,) আমরা তো তোমাদের খাওয়াই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। আমরা তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও নই।’ (সুরা দাহর : ৮-৯)।
ব্যক্তিগতভাবে বা পারিবারিকভাবে একটি সদকা বাক্স রাখা যেতে পারে, যেখানে প্রতিদিন সাধ্যমতো অর্থ জমা করা হবে। এতে পরিবারের সকল সদস্য দানের প্রতি উৎসাহিত হবে এবং শিশুরা ছোটবেলা থেকেই মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন পরোপকারী হিসেবে গড়ে উঠবে। মাস শেষে এই অর্থ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করা হলে তাদের কষ্ট লাঘব হবে এবং দাতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। যারা সুখী ও নির্মল জীবন প্রত্যাশা করে, তাদের উচিত বিষণ্ণ ব্যক্তিকে আনন্দিত করা এবং অন্যের ভাঙা মনকে চাঙা করার চেষ্টা করা। মনে রাখতে হবে, আমাদের পার্থিব সঞ্চয় একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর কাছে যা প্রেরণ করব, তা পরকালীন সঞ্চয় হিসেবে স্থায়ী হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কাছে যা কিছু আছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে; আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তা স্থায়ী।’ (সুরা নাহল : ৯৬)। তিনি আরও বলেন, ‘(স্মরণ রেখ) তোমরা যে কোনো সৎকর্ম নিজেদের কল্যাণার্থে সামনে (আখেরাতে) প্রেরণ করবে, আল্লাহর কাছে তা পাবে। নিশ্চয় তোমরা যে কোনো কাজ কর, আল্লাহ তা দেখছেন।’ (সুরা বাকারা : ১১০)।

















